করোনাভাইরাস ও বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প

0
121
Kishore-Raihan
Kishore-Raihan

সাধারণত আমাদের সব বাবা মায়েরই ইচ্ছা থাকে সন্তান বড় হয়ে কোন নামি দামি পেশায় ( Profession ) জীবন শুরু করবে। আমার বাবা মা ও তার ব্যতিক্রম নয়। আমার মা চাইতেন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবো, আর বাবা চাইতেন তার মতো সামরিক অফিসার হই কিংবা মেরিনার (নাবিক)।

কিন্তু আমরা যখন নিজের পছন্দ তৈরী করতে শিখি তখন পেশার ব্যাপারে ও নিজের একটি ইচ্ছে তৈরি হয়, যেমনটা হয়েছিল আমারও।

ডিটেকটিভ হওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল আমার উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত। আসলে উপরের চারটির কোনটিই আমার হয়ে ওঠা হয়নি। হয়ে গেলাম পর্যটন প্রেমী ও এক্সপ্লোরার। আর একটা পর্যায়ে এসে এই পর্যটনকে ঘিরেই শুরু হল আমার ক্যারিয়ার।

আরও পরুনঃ বাংলাদেশি ট্যুরিস্ট থেকে আঞ্চলিক ফি নেবে ভুটান

একযুগেরও বেশি সময় পরে গত নভেম্বরে নিজের প্রতিষ্ঠানের কিছুটা সুন্দর অবস্থান অনুভূত হয়, এবং প্রত্যাশা জাগে অনেক সুন্দর আগামীর। কিন্তু ২০২০ এ পার করা দিনগুলোর মতো ভয়ংকর অতীত এবং বিভীষিকাময় ভবিষ্যৎ আমি আমার পেশাগত জীবনে এর আগে কখনও সম্মুখীন হইনি।

গত তিন মাসে প্রশাসনিক খরচ-সহ আমার মোট ব্যবসায়িক ক্ষতি ১৯ লাখ টাকার অধিক। আর সামনে ভয়ংকর ভবিষ্যতের হাতছানি তো রয়েছে। আমার নিজের কথা বললাম যেন একটি নিরীক্ষিত উদাহরণ আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারি।

আটাব এর ৩ হাজার ৯০০ সদস্যের বাইরে বাংলাদেশে শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করেন এমন ট্যুরিজম ব্যবসায়ীর সংখ্যাটাও নেহায়েত কম নয়। সিটি করপোরেশন ভিতরে বাহিরে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে এই খাতের ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেসরকারি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে লাইসেন্স নেওয়া প্রতিষ্ঠান এর দ্বিগুনেরও বেশি।

আমাদের ট্রাভেল অ্যাজেন্টদের জন্য বাধ্যতামূলক কিছু নিয়মকানুন থাকলেও ট্যুর অপারেটরদের জন্য সরকারীভাবে এখনও জোর দিয়ে বলার মত তেমন কোন নীতিমালা বাস্তবায়ন হয়নি। আর রেজিষ্ট্রেশনবিহীন অনলাইন ভিত্তিক তরুণ ট্যুর অপারেটরের সংখ্যাটা ও কম গুরুত্ব বহন করে না। এদেশের পর্যটনের সত্যিকারের প্রচার ও প্রসার হয়েছে অনেকাংশে তাদের হাত ধরে। 

এ ছাড়া পর্যটনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত পরিবহন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ট্যুর গাইড ও ভ্রমণস্থানের আশপাশের হস্তশিল্প এবং স্যুভেনির নির্মাতা ও ব্যবসায়ীরা তো আছেই, যারা আমাদের পর্যটনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাছাড়া যেসকল প্রান্তিক মানুষগুলো পর্যটন নির্ভর জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের বাদ দিয়ে আমাদের পর্যটনের অস্তিত্বই কোথায়?

উপরের এই সকল পেশাজীবীরা আজ মহাসংকটময় অবস্থানে আছে। বলা যায় অস্তিস্ত সংকটেই পড়ে গেছে। ট্যুরিজম বোর্ডের হিসাব অনুযায়ি মার্চ ও এপ্রিল মাসে পর্যটন শিল্পে ক্ষতির পরিমান ১৩ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। এই হিসাবের মধ্যে শুধু মাত্র বেসরকারি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে লাইসেন্স নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করা হয়েছে। যার সংখ্যা আমার জানা মতে ৪ হাজারের অধিক নয়।

কিন্তু, পর্যটনের সাথে সম্পৃক্ত সকল পেশাজীবীর সঠিক হিসেব নির্ণয় করলে এই ক্ষতির পরিমানটা দাঁড়াবে ২৫ থেকে ৩০হাজার কোটি টাকা।অন্যথায় দু’মাসের ক্ষতির পরিমান যদি এটা হয় তবে এক বছরে এর পরিমান দাঁড়াবে ১৮০ হাজার কোটি টাকা। যা এড়িয়ে যাবার কোন সুযোগ নেই।

এ ছাড়া জুন, জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ কি? কেউ জানিনা আমরা, এটা আমি হলফ করে বলতে পারি।

প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪০ লাখ মানুষ এ দেশের পর্যটন পেশার সাথে জড়িত। যাদের পরিবারের গড় সদস্য যদি ৫ জনও হয়, তবে ২ কোটি মানুষ এই আয়ের উপর নির্ভর করে, যা আজ গত কয়েকমাস ধরেই শুন্যের কোটায়।

একটা পরিসংখ্যানে জানা গেছে, অনলাইন বেজড ট্যুর অপারেটর যাদের অফিস, ট্রেড লাইসেন্স, ট্যাক্স ও অধিক কর্মীর জন্য খরচের মাথাব্যাথা নেই তাদেরও বর্তমানে এই সেক্টরে বিনিয়োগের পরিমান ১৫ হাজার কোটি টাকারও অধিক। তাহলে চিন্তা করুন এর বিপরীতে যারা ওই সকল খরচ বহন করে চলেছে, তাদের বিনিয়োগের পরিমানটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, আর তাদের বর্তমান অবস্থাটা কি কিছুটা আপনার কল্পনার বাইরে গিয়ে দাঁড়ায় না!

আফসোসের বিষয় হচ্ছে এত গুরুত্ব পূর্ণ একটি খাত যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে, ২০১৯ সালে জিডিপিতে যার অবদান ছিল ৭২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, সরকারের কোন মন্ত্রণালয়েরই এই খাতের প্রতি উদাসীনতা ছাড়া আন্তরিকতার ছাপ নেই।

মহোদয়গণ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় কি শুধু পদ্মাসেতু, হাতিরঝিল, আইসিটি ও মহাসড়কের মতো বিষয়গুলোকে নিয়েই পরিকল্পনা করবে!ট্যুরিজমের জন্য একটা মাষ্টারপ্লান তৈরি করার সময় কি এখনও আসেনি? যা অবদান রাখবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে, জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে, ট্যুরিজম পেশাজীবীদের এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এই খাতের বিনিয়োগের।

অর্থমন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সকল প্রণোদনা এবং ঋণ নীতিমালা কি হলমার্কের মতো ঋণখেলাপী কোম্পানিগুলোর জন্য! যারা বার বার নতুন ও রি-ফাইন্যান্সিং সুবিধা ভোগ করবে আর পর্যটনের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্প রয়ে যাবে দৃষ্টির অগোচরে!

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কি খেলাধুলার বাইরে, শুধুমাত্র যারা গবাদিপশুর খামার ও মৎস্য পালন করবে তাদের ব্যাতিত দেশের অন্য যুবাদের যুবা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ! 

পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত যুবাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রাথমিক অর্থায়নের চিন্তার অবকাশ নেই কি?

আমাদের পরনির্ভরশীল (বেসামরিক বিমান পরিবহনের অংশ) পর্যটন মন্ত্রণালয়, যার দায়িত্ব সবচাইতে বেশি, যারা চলমান পরিস্থিতিতে আমাদের জন্য সঠিক কোন দিকনির্দেশনা, প্রণোদনা, এবং ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট কোন রকম অনুদানের আবেদন করে নাই, যা পেশাজীবীদের জন্য হতাশাজনকই বটে।

সিভিল অ্যাভিয়েশন লাইসেন্সই যদি ট্রাভেল অ্যাজেন্সি ও ট্যুর অপারেটরের মানদণ্ড হয়, তাহলে বলবো সেটা প্রাপ্তিতো অনেকটা সমুদ্রবিজয়ের মতোই। সবকিছু ঠিক থাকার পরও তিন বছরের সরকারি ফি এর দ্বিগুন পরিশোধ করতে হয় প্রতিষ্ঠান মালিকদের। আর নবায়নের সময় ব্যবসায়ীরা এখন লাইসেন্স বাতিলের নতুন হুমকির সম্মুখীন। বিষয়টা অনেকটা “গোপাল আমার আরও চাই আরও দাও” এর মতো!

পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স প্রাপ্তির মতো আমাদের এই জায়গাটাও অনেকদিন ধরেই শোষণ করে যাচ্ছে। যেটাকে আমি আমার পূর্ববর্তী প্রবন্ধে প্রশাসনিক চাঁদাবাজি হিসেবে অভিহিত করেছিলাম।

আমাদের ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনগুলো, যাদের সদস্যপদের জন্য মোটা অংকের টাকা গুনতে হয়, বাৎসরিক রিনিউ ফি বাবদ দিতে হয় উল্লেখযোগ্য পরিমান টাকা। আর আমাদের এফবিসিসিআই যে ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিত্ব করে, আজকের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে তাদের ভূমিকাটা কি? কেউ কি একবার প্রশ্ন করেছেন নিজেদেরকে কিংবা তাদেরকে? অর্থনৈতিক সাহায্য নিয়ে আজ তারা সদস্যদের পশে নেই কেন? এতো বেশি সদস্য ফি ও নবায়ন ফি হওয়ার পরও অর্থসংকট তো হওয়ার কথা নয়! ট্রেড বডিগুলো কি এফবিসিসিআইকে এমন কোন প্রস্তাব দিয়েছে যেটা নিয়ে তারা সরকারের উপর মহলে আমাদের হয়ে দরকষাকষি করবে?

আজ সংকটকালীন সময়ে যদি আপনাদের পাশে না পাই, তাহলে সুসময়ের বন্ধু আর পরহস্তে ধন, কোনটাই কাম্য নয় বটে। এ পেশার সাথে জড়িত ৪০ লাখ মানুষ যাদের পরিবারের গড় সদস্যের নূন্যতম সংখ্যা ২ কোটি। অনেকের মতে, ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে ইহা প্রায় ৭ কোটি ২৫ লাখ অর্থাৎ ততটাই স্বপ্ন, জীবন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জীবিকার প্রশ্ন, বর্তমানে যারা অনেকই মৌলিক অধিকার থেকেই বঞ্চিত।

আজকের এই করোনাকালীন পরিস্থিতিতে “অন্য শিল্পের জন্য প্রণোদনা, হতদরিদ্রের জন্য ত্রাণ, আর ট্যুরিজম শিল্পের সবাই সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে যান” নীতিতেই চলছে।যা একটি দেশের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্প ও এর সাথে জড়িত এতগুলো মানুষের সাথে রাষ্ট্রের উপহাস বৈকি।

এভাবে চলতে থাকলে রাষ্ট্রকে অতিদ্রুত রোহিঙ্গাদের চেয়েও বড় বহরে পর্যটন রিফিউজিদের মোকাবেলা করতে হবে, যা কখনোই রাষ্ট্র বা সমাজের জন্য সুখকর নয়। 

যে বিষয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক ও গবেষক জনাব মোখলেছুর রহমান এ দেশের পর্যটন প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে অনেক আগেই আশংকা প্রকাশ করেছিলেন।

আমার পূর্ববর্তী প্রবন্ধে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সংকট উত্তরণে ১৪টি সময়োপযোগী প্রস্তাব রেখেছিলাম। গত কিছুদিন আগে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষে টি ও নন-টি ও এবং দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যটন স্কলারদের নিয়ে সম্মিলিত পর্যটন জোট গঠিত হয়। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সিইও’র সাথে অনলাইন মিটিং এ জোটের মাননীয় আহবায়ক ১৭টি প্রস্তাবনা পেশ করেন, বিজ্ঞ বোর্ড প্রস্তাবসমূহ যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত বলে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়নের জন্য প্রক্রিয়াধীন বলে আমরা ইতোমধ্যে জানতে পেরেছি।

আমরা আশাকরি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতিদ্রুত পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত মানুষগুলোর পাশে এসে দাঁড়াবেন, অন্যথায় রাষ্ট্র বেকারত্ব, ক্ষুধা ও দারিদ্রের হাহাকারে অচিরেই করোনার চেয়েও বড় সংকটের সম্মুখীন হবে।

লেখকঃ কিশোর রায়হান
ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপ্লোরার’স অ্যাসোসিয়েশন

আপনার কোন প্রশ্ন থাকলে বা এই বিষয়ে কোন কিছু জানানোর থাকলে নীচের মন্তব্য বিভাগে লিখতে ভুলবেন না । আপনার ভ্রমণ পিয়াশি বন্ধুদের সাথে নিবন্ধটি শেয়ার করে নিন যাতে তারাও জানতে পারে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here