খ্যাতির আড়ালে হারানো কীর্তি যাদের…..( প্রেক্ষাপট পর্যটন ) দ্বিতীয় পর্ব

0
26

কিশোর রায়হান

প্রারম্ভিকাঃ কোন দেশ বা জাতি (ব্যক্তি) সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে জানতে হয় সেই দেশ বা জাতির (ব্যক্তির) সংস্কৃতি সম্পর্কে। আর ভাষা, পর্যটন ও সাহিত্য, সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়। যুগে যুগে পৃথিবী এমন কিছু মানুষকে পেয়েছে যারা তাদের লেখনীতে যেমনটা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন ও কর্মে করেছেন অনুপ্রাণিত, সেই সাথে তাদের জীবনাচরণের মাধ্যমে অনুপ্রেরণাময় সোনালী ইতিহাস তৈরী করেছেন সংস্কৃতির অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পর্যটনে। যা বর্তমান প্রজন্মের পর্যটকদের জন্য আইডল উদাহরণই বটে। আগের পর্বে আলোচনা করেছিলাম হুমায়ন আহমেদ এবং সৈয়দ মুজতবা আলী কে নিয়ে। আজকে যাদেরকে নিয়ে আলোচনা করবো তাদেরকে মূলত আমরা জানি বিপ্লবী কিংবা বিদ্রোহী হিসেবে। কিন্তু তাঁদের জীবনের বড় একটা অংশ জুড়ে রয়েছে পরিব্রাজক এর পরিচয়। যা আমাদের মধ্যে ভ্রমণ স্পৃহা তৈরী করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

• এর্নেস্তো চে গুয়েভারা (১৪ জুন, ১৯২৮ – ৯ অক্টোবর, ১৯৬৭)

“সবাই প্রত্যেকদিন চুলে চিরুনি চালায় যাতে চুল সুন্দর পরিপাটি থাকে, কেউ কেনো হৃদয় সুন্দর পরিপাটি রাখে না?” এই উক্তিটির অর্থ বুঝতে পারেলে তার বিশাল ব্যক্তিত্ব নিয়ে কিছুটা অনুমান করা যায় ।
আজকের তরুণদের কাছে প্রচন্ড পরিচিত একটি নাম, ‘চে’ সত্যিই কি তাই? স্টাইলিশ টি-শার্টের সামনে পেছনে আজ ‘চে’ সত্যিই উজ্জ্বল! কিন্তু বুক পকেটের নিচের ঐ মনটাতে? ক্রমেই আধুনিকতার দাবি করতে থাকা আজকের এই তরুণদের চেতনাতে? চে গেভারা/ গুয়েভারা, প্রকৃতপক্ষে ‘আর্নেস্তো গেভারা দে লা সেরনা’ নামের ব্যক্তির পরিচয় ক্রমশই হচ্ছে বিলুপ্ত। ‘চে’ নামের খুব জনপ্রিয় ‘ব্র্যান্ড’টি অস্পষ্ট করে দিচ্ছে ব্যক্তি চে’ কে। ‘চে’ তার প্রকৃত নাম নয়, যদিও এটিই সবচেয়ে বেশি পরিচিত তার ক্ষেত্রে। স্প্যানিশ ভাষায় ‘চে’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘প্রিয়’ কিউবায় সফল বিপ্লবের পর সেখানকার অধিবাসীগণ তার নাম দিয়ে দেয়-‘চে’। তিনি এই নামটিকে এত বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন যে ১৯৬০ থেকে ১৯৬৭ সাল, অর্থাৎ তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তার স্বাক্ষর হিসেবে ব্যবহার করতেন শুধুই এই শব্দটি -‘চে’। ১৯২৮ সালের ১৪ই জুন আর্জেন্টিনার রোসারিও গ্রামে জন্ম নেন এই প্রবাদপুরুষ এর্নেস্তো চে গুয়েভারা, তিনি ছিলেন একজন আর্জেন্টিনীয় পরিব্রাজক, মার্কসবাদী বিপ্লবী, চিকিত্সক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, গেরিলা নেতা, কূটনীতিবিদ, সামরিক তত্ত্ববিদ এবং কিউবার বিপ্লবের প্রধান ব্যক্তিত্ব। মৃত্যুর পর তার শৈল্পিক মুখচিত্রটি একটি সর্বজনীন প্রতিসাংস্কৃতিক প্রতীক এবং এক জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিশ্বপ্রতীকে পরিণত হয়।

হাঁপানিতে সারা জীবন ভোগা সত্ত্বেও তিনি দারুন মল্যবিদ ছিলেন। ঘোড়সওয়ারিও শিখেছিলেন শখ করে, কিছুই বোধহয় বাদ দিতে চাননি চে…হয়তো জীবনের কোন স্বাদই! তার খেলাধুলার পছন্দ তালিকায় ছিল সাঁতার, ফুটবল, গলফ, শুটিং। চে সাইক্লিংয়ের একজন অক্লান্ত খেলোয়াড় ছিলেন। যখনই সময় পেতেন ঘন্টার পর ঘন্টা সাইক্লিং করতেন। পাড়ি দিয়েছিলেন প্রায় ৪০ হাজার কি. মি. পথ। ১৯৫১ সালে লেখাপড়ায় এক বছর বিরতি দিয়ে আলবার্টো গ্রানাডো নামক এক বন্ধুকে সাথে করে মোটর সাইকেলে দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমনে বেরিয়ে পড়েন । যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পেরুর সান পেবলোর লেপার কলোনিতে স্বেচ্ছা সেবক হিসেবে কয়েক সপ্তাহ কাজ করা। এক বান্ধবীর নিকট থেকে ১৫ ডলার ধার করে যাত্রা শুরু করেন, এবং প্রায় ১৪ হাজার কি. মি. পথ তিনি দক্ষিণ আমেরিকাতে ভ্রমণ করেন । এই অভিজ্ঞতা থেকে তার ডায়েরীতে (The Motorcycle Diaries) তিনি লিখেছেন, ‘মানব সত্ত্বার ঐক্য ও সংহতির সর্বোচ্চ রুপটি এসকল একাকী ও বেপরোয়া মানুষদের মাঝে জেগে উঠেছে’। তার এই দিনলিপি নিউয়র্ক টাইমস এর বেস্ট সেলার এবং পরে একই নামে (The Motorcycle Diaries) চলচিত্র বের হয় যা পুরস্কৃত হয়েছিল।

১৯৫৩ সালের ৭ই জুলাই, চে আবারও বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, পানামা, কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস এবং সালভাডরের উদ্দ্যেশে বের হন। গুয়েতেমালা ছাড়ার আগে ১৯৫৩ সালের ১০ ডিসেম্বর কোষ্টারিকা থেকে তার আন্টিকে সব কিছুর বৃত্তান্ত দিয়েছিলেন। চিঠিতে তিনি ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির বিভিন্ন প্রদেশে ভ্রমণের কথা লিখেছিলেন। এই ভ্রমণ তাকে নিয়ে যায় আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, পানামা ও মিয়ামির মধ্য দিয়ে বুয়েন্স আয়ার্স এর দিকে। ভ্রমণের শেষ দিকে তিনি এই মত পোষণ করেন যে দক্ষিণ আমেরিকা আলাদা আলাদা দেশের সমষ্টি নয় বরং এক অভিন্ন অস্তিত্ব যার প্রয়োজন মহাদেশ ব্যপী স্বাধীনতার জাগরণ ও স্বাধীনতার পরিকল্পনা । পরবর্তিতে তার নানা বিপ্লবী কর্মকান্ডে এই একক, সীমানাবিহীন আমেরিকার চেতনা ফিরে আসে বার বার। ১৯৫৪ সালের শুরুর দিকে গুয়েভারা মেক্সিকো শহরে পৌছান এবং সদর হাসপাতালে এলার্জি বিভাগে চাকুরি করেন। পাশাপাশি ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভির্সিটি অব মেক্সিকোতে চিকিৎসা বিষয়ে প্রভাষক এবং লাতিনা সংবাদ সংস্থার চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৫ সালের জুন মাসে তার বন্ধু নিকো লোপেজ, রাউল কাস্ত্রোর সাথে তার পরিচয় করান এবং পরে তার বড় ভাই ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে পরিচিত হন।

“চে কী ছিলেন?”-এই প্রশ্ন না করে বোধহয় প্রশ্ন করা উচিত, “চে কী ছিলেন না?” প্রবল ধরনের ভ্রমণপিয়াসু মন ছিল চে’র, সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়তেন বেড়াতে। তরুণ চে যখন সবেমাত্র ডাক্তারির পড়াশোনা করছেন সে সময় সমগ্র লাতিন আমেরিকা ভ্রমণের ঝোঁক চাপে তার, যেই ভাবা সেই বেরিয়ে পড়লেন আর কি! ঐ ভ্রমণটি তার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ ছিল, কারণ তখনই তার চোখে ভালো করে ধরা পড়ে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সার্বিক অসহায়ত্ব। চারপাশে মূর্তমান দারিদ্রের কশাঘাত চে’র তরুণ মনে গভীর রেখাপাত করে। এই ভ্রমণ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে চে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই অঞ্চলে বদ্ধমূল অর্থনৈতিক বৈষম্যের স্বাভাবিক কারণ হলো একচেটিয়া পুঁজিবাদ, নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ। চে অনুভব করেন, পরিবর্তন অনিবার্য, আর এই পরিবর্তনের জন্য আরো বেশি অনিবার্য একটি সশস্ত্র বিপ্লব। তিনি বিশ্বাস করতেন বিপ্লব কেউ কাউকে প্রদান করে না, বিপ্লব ছিনিয়ে আনতে হয়, বিপ্লব ঘটাতে হয়; কেউ কাউকে শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে দেয় না, মুক্ত নিজেদেরকেই হতে হয়। আর তার পর একজন আর্জেন্টিনীয় পরিব্যাজক এর একজন বিপ্লবী হয়ে উঠা।

এই ভ্রমণের ফলস্বরূপই চে গুয়েতামালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং ধীরে ধীরে তার বৈপ্লবিক চেতনার ধারণা বদ্ধমূল হতে থাকে। একাধারে মার্ক্সবাদী, বিপ্লবী, চিকিৎসক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, গেরিলা নেতা, কূটনীতিবিদ, সামরিক তত্ত্ববিদ এবং অবশ্যই যে পরিচয়টি চে’কে ‘চে’ করে তোলার পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছে সেটা হচ্ছে- তিনি ছিলেন কিউবা বিপ্লবের প্রধান ব্যক্তিত্ব। বেড়াতে, বেড়াতে ঘটনাক্রমে মেক্সিকো সিটিতে ফিদেল ক্যাস্ট্রো ও রাউল ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে পরিচয় হবার পর তিনি প্রভাবান্বিত হয়ে তাদের আন্দোলনে যোগদান করেন এবং তারা কিউবার তৎকালীন একনায়ক বাতিস্তাকে উৎখাত করার লক্ষ্যে আন্দোলন পরিচালনা করেন। দুই বছরব্যাপী তাদের আন্দোলনটি সফল হয় এবং চে কিউবার জনগণের কাছে আপনজন হিসেবে আদৃত হন, একজন বিপ্লবী হিসেবে হন বিশ্বপরিচিত।

যুদ্ধচলাকালীন চে বিদ্রোহী সেনাবাহিনীর অখণ্ড অংশ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ফিদেল কাস্ত্রোকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, কূটনীতি এবং অধ্যবসায়ের কথা জানিয়ে ছিলেন। গুয়েভারা গ্রেনেড তৈরির কারখানা, রুটি সেকানোর জন্য চুল্লি প্রস্তুত এবং নিরক্ষর সঙ্গীদের লেখাপড়ার জন্য পাঠশালা তৈরি করেন। তাছাড়াও তিনি একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, সামরিক প্রশিক্ষনের কর্মশালা আয়োজন এবং তথ্য সরবরাহের জন্য পত্রিকা প্রচার করতেন। বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন তিন বছর পর তাকে ’’কাস্ত্রোর মস্তিষ্ক” বলে আখ্যায়িত করেছিল। তার পর তিনি বিদ্রোহী বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে পদোন্নতি পান।

১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গুয়েভারা বিশ্বের বিপ্লবীদের কূটনীতিক হিসেবে পরিচিতি পান। তাই তিনি কিউবার প্রতিনিধি হয়ে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদান করার জন্য নিউ ইয়র্ক শহরে যান। ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৯তম অধিবেশনে, আবেগ অভিভূত বক্তব্যে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার জাতিগত বৈষম্যের কঠোরনীতি দমনে জাতিসংঘের দুর্বলতার কথা বলেন। এটাকে বন্ধ করার জন্য জাতিসংঘের কোন পদক্ষেপ আছে কি না জানতে চেয়ে প্রশ্ন তোলেন। গুয়েভারা তখন নিগ্র জনগনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কঠোর নিন্দা জ্ঞাপন করেন। ক্রোধান্বিত গুয়েভারা ‘সেকেন্ড ডিক্লেরেশন অব হাভানা’ নামক একটি আবেগপূর্ণ ঘোষণার উল্লেখ করে তার বক্তৃতা শেষ করেন। তিনি বলেন যে তার এই ঘোষণার জন্ম হয়েছে ক্ষুধার্ত জনগন, ভূমিহীন কৃষক, বঞ্চিত শ্রমিক ও প্রগতিশীল মানুষের দ্বারা। বক্তব্যের শেষ করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, সারা বিশ্বের শোষিত জনগোষ্ঠীর একমাত্র চিৎকার এখন “হয় স্বদেশ অথবা মৃত্যু”।

কিউবা বিপ্লবের ৬০ বছর পূর্তিতে দিল্লিতে এসে চে কন্যা খোলাখুলিই জানালেন তাঁর বাবার কলকাতা ভ্রমণের কথা, ‘১৯৫৯ সালের ৩০ জুন তিনি দিল্লিতে এসেছিলেন, তিনি তখন কাস্ত্রো মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য ৷ সাত দিনের সফরে সেই সময়েই তিনি কলকাতায় গিয়েছিলেন, ওখানকার টাউনহলে বক্তৃতা করেন ৷ দেখা করেছিলেন সেই জমানার বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতাদের সঙ্গে৷

১৯৬৫ সালে গুয়েভারা আফ্রিকায় যাবার সিদ্ধান্ত নেন এবং কঙ্গোতে চলমান যুদ্ধে তার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান কাজে লাগাবার প্রস্তাব দেন। আলজেরিয়ার রাষ্ট্রপতি আহমেদ বিন বেল্লার মতে, গুয়েভারা আফ্রিকাকে রাজতন্ত্রের দুর্বল ঘাঁটি ভেবেছিলেন। তাই সেখানে বিপ্লবের প্রচুর সম্ভনা তিনি দেখেছিলেন। মিশরের রাষ্ট্রপতি জামাল আব্দেল নাসের, ১৯৫৯ সালের সাক্ষাতের পর যার সাথে চে এর ভ্রাতৃত্বপুর্ণ সম্পর্ক ছিল, তিনি কঙ্গো আক্রমণের পরিকল্পনাকে বোকামি হিসেবে দেখেছিলেন। এই সতর্কতা সত্ত্বেও গুয়েভারা মার্কসবাদীদের সহায়তায় আক্রমণ চালিয়ে যাবার জন্য তৈরি হন। ১৯৬৫ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি, তার সেকেন্ড কমান্ড ভিক্টর বার্ক এবং ১২ জন সহচরী নিয়ে কঙ্গোয় পৌছান, আর বলিভিয়ার জঙ্গল থেকে লেখা চিঠিতেই বন্ধু ফিদেলকে সরাসরি চে জানিয়ে দিচ্ছেন, ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে’! মানে, তিনি আর থাকতে চান না কিউবান কমিউনিস্ট পার্টির কোনও ‘সরকারি’ পদে। থাকতে চান না অত্যাচারী বাতিস্তা সরকারকে হটিয়ে গড়া বিপ্লবী সরকারের জাতীয় ভূমি সংস্কার প্রতিষ্ঠানের শিল্প দফতরের প্রধানের পদে। থাকতে চান না জাতীয় ব্যাঙ্কের সভাপতি, শিল্প দফতরের মন্ত্রী। বন্ধুকে ছেড়ে ‘বিশ্ববিপ্লবে’র প্রয়োজনে অন্য ভূখণ্ডে পাকাপাকি ভাবে চলে যাওয়ার মুখে ফিদেলকে লেখা সেই চিঠিতে চে লিখেছিলেন, ‘‘আনুষ্ঠানিক ভাবে যা যা করার আমি তা করেছি। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে আমার সব পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছি। মন্ত্রিত্ব ছেড়েছি। সেনাবাহিনীর কমান্ডার পদে ইস্তফা দিয়েছি। কিউবার নাগরিকত্ব ছেড়েছি। কোনও আইনই আর আমাকে কিউবায় বেঁধে রাখতে পারবে না। শুধু অদৃশ্য একটা বন্ধন, তোমার সঙ্গে আমাকে বোধহয় চির দিনের জন্যই বেঁধে দিয়েছে। যা কখনও ভাঙা যায় না। ভাঙা যাবে না। আমি অন্য দেশে বিপ্লব সংগঠনে যাচ্ছি বলে আনন্দ হচ্ছে। কিন্তু এই কিউবার মানুষগুলিকে ছেড়ে যাচ্ছি বলে আমার দুঃখটাও কম হচ্ছে না।

চে’র ‘মোটরসাইকেল ডায়েরীস’ থেকে পাওয়া যায়, চে ভালবাসতেন কবিতা, কবিতা পড়তে। আবৃত্তি করতে কখনো তার ক্লান্তি হতো না। বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই কবিতাসক্ত ছিলেন তিনি, খুব ভালো কবিতা আবৃত্তিও করতেন। বলা যায়, অনিশ্চিত জীবনের ফাঁকে কবিতায় চে খুঁজতেন এক পশলা স্বস্তি। রুডিয়ার্ড কিপলিং এর ‘if’ ও জোসে হার্নান্দেজ এর ‘martin fierro’ কবিতা দুটি তিনি সবচেয়ে বেশি আবৃত্তি করতেন, পছন্দের তালিকায় এরা ছিল প্রথম। দুটি কবিতার মতই তার জীবনে এসেছিলেন দু’জন নারী, তার দুই স্ত্রী। সবমিলিয়ে চে পাঁচ সন্তানের পিতা ছিলেন এবং সংসার জীবনে অত্যন্ত সন্তানবৎসল পিতা ছিলেন এই বিপ্লবী। জানা যায়, শেষবিদায়ের সময় স্ত্রী-সন্তানকে চিঠি দিয়ে গিয়েছিলেন চে।

চে ছিলেন এক বিশিষ্ট লেখক (ডায়েরি-লেখক)। গেরিলা যুদ্ধের ওপর তিনি একটি ম্যানুয়েল রচনা করেন। চে গুয়েভারা কিউবান ভাষায় লিখেছেন প্রায় ৭০টি নিবন্ধ, ধারণা করা হয় ছদ্মনামে কিংবা নামহীন অবস্থায় লিখেছেন ২৫টি। এছাড়া তিনি লিখে দিয়েছেন পাঁচটি বইয়ের ভূমিকা। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত ভাষণ আর সাক্ষাৎকার দিয়েছেন প্রায় ২৫০-এর কাছাকাছি । বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে লেখা তার অসংখ্য চিঠির মধ্যে সংগৃহিত আছে ৭০টির মতো। তার লেখালেখি নিয়ে এখন পর্যন্ত বের হয়েছে নয় খণ্ড রচনাবলি। প্রতিদিনকার ঘটনাবলী লিখে রাখার অভ্যাস ছিল তার, গেরিলা যুদ্ধকালীন যখন সবাই বিশ্রাম নিত তখন অন্যদের অবাক করে দিয়ে চে তার নোটবই বের করে ডাক্তারদের হস্তাক্ষরের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রায় অস্পষ্ট অক্ষরে লিখে চলতেন ডায়েরী। এই ডায়েরীটি তার বলিভিয়ার ডায়েরী বলে খ্যাত। এই ডায়েরীতে গেরিলা প্রধান হিসেবে তার দৃঢ় চরিত্রের বারংবার প্রমাণ মেলে।

বাংলাতে অনুবাদ করা আর্নেস্তো চে গুয়েভারা এর কিছু বই সমূহ যেমন – আমাদের আর তাহাদের আমেরিকা, আবার পথে, ডাক দিয়ে যাই, মোটর সাইকেল ডায়েরি : দক্ষিন আমেরিকা ভ্রমণ, চেগুয়েভারা’র ডায়েরি, বলিভিয়ান ডায়েরি। তার কিছু অমর বাণী আপনাদের জন্য তুলে ধরছি : “সবাই প্রত্যেকদিন চুলে চিরুনি চালায় যাতে চুল সুন্দর পরিপাটি থাকে, কেউ কেনো হৃদয় সুন্দর পরিপাটি রাখে না?” “নতজানু হয়ে সারা জীবন বাঁচার চেয়ে আমি এখনই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত”, “বিপ্লবী হতে চাও? বিল্পবের প্রথম শর্ত, শিক্ষিত হও” “আমরা কিসের জন্য বাঁচব সেটা আমরা নিশ্চিত হতে পারি না যতক্ষণ না আমরা তার জন্য মরতে প্রস্তুত থাকি” ।

মার্কসবাদী বিপ্লবী চে গুয়েভারার মৃত্যুর ৫০ তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়ারল্যান্ড থেকে যে ডাকটিকিট বের করেছে এই ডাকটিকিটে ব্যবহৃত হয়েছে ডাবলিনের চিত্রশিল্পী জিম ফিটজপ্যাট্রিকের আঁকা চে গুয়েভারার ছবি – যা সারা পৃথিবীতে সুপরিচিত। চে গুয়েভারার পিতা আরনেস্তো গুয়েভারা লিঞ্চ একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন – যার পূর্বপুরুষ ছিলেন আইরিশ। প্রথম দিনের ডাকটিকিটের খামে মি. লিঞ্চের একটি উক্তি রয়েছে: “আমার পুত্রের শিরায় শিরায় আইরিশ বিদ্রোহীদের রক্ত বইছে।”

১৯৬৭ সালের ৯ই অক্টোবর সারারাত বলিভিয়ার লা হিগুয়েরা গ্রামের একটি স্কুলঘরে আটকে রেখে তাকে হত্যা করা হয়। তার হত্যাকারী ছিলেন বলিভিয়া সেনাবাহিনীর মদ্যপ সার্জেন্ট মারিও তেরান। মৃত্যুর পরপরই তিনি বিশ্বজুড়ে বিপ্লবীদের কাছে নায়ক হয়ে ওঠেন। তাকে হত্যার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও লাতিন আমেরিকার একনায়ক শাসক আলফ্রেদো ট্রয়েসনারের হাত ছিল বলে তথ্য দিয়েছেন প্যারাগুয়ের গবেষক মার্টিন আলমাদা। মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্তে চে গুয়েভারা সৈনিকদের বলেছিলেন, “আমাকে গুলি করো না, আমি চে গুয়েভারা, আমাকে মেরে ফেলার পরিবর্তে বাঁচিয়ে রাখলে তোমাদের বেশি লাভ হবে।“ একটা মানুষ কতটা আত্মবিশ্বাসী হলে মৃত্যর দরজায় দাঁড়িয়ে এমনটা বলতে পারেন ! চে’কে সমাহিত করা হয় কিউবার সান্তা ক্লারায়, তার ভালবাসার স্থানে।

বিপ্লব কখনো বিপ্লবীর মৃত্যুর সাথে শেষ হয়ে যায় না, তেমনি ভাবে ভ্রমণ শেষ হলে গোলেও চে’ও তাই বেঁচে থাকবেন তার কর্মে আজকের ও আগামীর পরিব্যাজক এবং বিপ্লবীদের মাঝে। টাইম পত্রিকা বিংশ শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তির যে তালিকা করেছে সেখানে চে নামও রয়েছে। একটি অমর বাণী আপনাদের স্মরণ করে আজকে এই মহান পরিব্যাজক এর জীবন চক্ররের ভ্রমণ গল্প শেষ করছি “আমরা কিসের জন্য বাঁচব সেটা আমরা নিশ্চিত হতে পারি না যতক্ষণ না আমরা তার জন্য মরতে প্রস্তুত থাকি”…. লা চে।

সারসমাপ্তিঃ একজন মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ও মেধা সারা পৃথিবীর মানবতার জন্য বিলিয়ে দিতে তখনই পারেন, যদি তার জীবনে সারা পৃথিবী কে আপন করে নেবার জন্য ভ্রমণের মানসিকতা থাকে।একজন পরিব্রাজক হিসেবে চে তার অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। যা আমাদের জন্য অনু করনিয়। এ সকল খ্যাতিমান মানুষের কীর্তি সমূহ অল্প কথায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তাঁরা সারাজীবনে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মান উন্নয়নে অবদান রেখেছেন বিভিন্ন ভাবে। আমি শুধু একজন পর্যটক ও ভ্রমণপ্রেমী মানুষ হিসেবে তাদের জীবনের কিছু গল্প তুলে ধরেছি। যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পর্যটন শিল্প এবং পর্যটক তৈরিতে যুগযুগ ধরে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে। অথচ আমরা তাদের এই অতিসাধারণ কীর্তিটাকে ঢেকে ফেলি অন্য কোন খ্যাতির আড়ালে। আমি সেই পর্দাটাকে সরিয়ে পর্যটন প্রেক্ষাপটে তাঁদেরকে আপনাদের সামনে আনার চেষ্টা করেছি মাত্র।

লেখকঃ কিশোর রায়হান
পরিচালক অপারেশন
বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপ্লোরারস এসোসিয়েশন – বিটিইএ

আপনার কোন প্রশ্ন থাকলে বা এই বিষয়ে কোন কিছু জানানোর থাকলে নীচের মন্তব্য বিভাগে লিখতে ভুলবেন না । আপনার ভ্রমণ পিয়াশি বন্ধুদের সাথে নিবন্ধটি শেয়ার করে নিন যাতে তারাও জানতে পারে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here