ছানার তৈরি মিষ্টি কি আসলেই আমাদের দেশীয়ঃ

0
194

ভিন্ন দেশ থেকে আগত কোন খাবার যা দীর্ঘদিন প্রচলনের পর এমন হয়েছে যে সেই খাবারটা এখন আমাদের নিজস্ব খাবার বলেই মনে হয়। এমনকি যেখান থেকে এই খাবারের প্রচলন শুরু হয়েছে, তাদেরকেও ছাড়িয়ে গেছে আমাদের সেই খাবারের চর্চা।

আর সেই খাবারটি হচ্ছে ছানার তৈরি মিষ্টি। খুব কম বাঙালিই পাওয়া যাবে, মিষ্টি শব্দটা শোনার পর যার জিভে জল আসে না। মিষ্টি আমাদের ছোট বড় সবার খুবই প্রিয় একটি খাবার। যে কোন উৎসব, পার্বণ, আচার, বিচার, খুশি সংবাদ মিষ্টি ছাড়া যেন অপূর্ণই থেকে যায়। সেই মধ্যযুগ থেকেই এই ছানার মিষ্টির প্রচলন চলে আসছে আমাদের দেশ গুলাতে। প্রাচীনকালে কিন্তু আমাদের দেশে ছানার মিষ্টি প্রচলিত ছিল না। আমাদের দেশে বা ভারত উপমহাদেশে পর্তুগিজরা প্রায় ৩৫০-৪০০ বছর আগে প্রথম ছানার মিষ্টির সাথে পরিচিত করে।

তারা প্রথম ভারতবর্ষে এসে ছানা কাটার পদ্ধতি শিখায় এবং হুগলীতে প্রথম মিষ্টির কারখানা স্থাপন করলে বাংলার ময়রাদের মধ্যে মিষ্টি বানানোর ধুম পড়ে যায়। রসগোল্লা, সন্দেশ, পান্তয়ার, গুলাব জামুন, কালোজমের মত হরেক রকম মিষ্টি তৈরি শুরু হয়। মুঘল খাবারের তালিকায় সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল কালোজাম এবং গুলাব জামুন। তাদের প্রতিবেলার খাবাররের সাথে থাকতোই এই মিষ্টি। পর্তুগিজরা ছানার মিষ্টি প্রচলন করার আগে কি তাহলে বাঙালিরা মিষ্টি খেত না? হ্যাঁ, তখনও মিষ্টির প্রচলন ছিল, তবে তাকে বলা যায় মিষ্টান্ন। মিষ্টি এবং মিষ্টান্ন এর মধ্যে একটা শব্দগত বস্তুগত পার্থক্য রয়েছে। মিষ্টি বলতে আমরা ছানার বা প্রচলিত মিষ্টিকে বুঝছি। কিন্তু মিষ্টান্ন বলে – মিষ্টি জাতীয় যে কোন ধরনের খাবারকে বুঝি, যেমন – হাতে তৈরি নাড়ু, হরেক রকম মিষ্টি জাতীয় পিঠা, পায়েস, চিড়া-খৈ-নাড়ু, বা দুধের তৈরি যে কোন মিষ্টি জাতীয় খাবার।

পর্তুগিজরা আসার আগে বাঙ্গালিরাও যে কোন খাবারের পর মিষ্টান্ন খেতেন এবং অতিথিদের আপ্যায়ন করতেন। পর্তুগিজরা আসার আগে কেউ কোন ভাবেই ছানার তৈরি মিষ্টি কেউ বানাত না। ছানাকে ধরা হত অচ্ছুৎ, মানে যাকে ছোঁয়া যায় না বা যাবে না। কারন, বলা হতো ছানা হচ্ছে দুধের বিকৃত রূপ। দুধ থেকে সরাসরি যা হয়, যেমন – দই, মালাই, ক্ষীর, মাখন, ঘি, পায়েস, ননী, মাখন এইসবই দুধেরই আরেক রূপ। কিন্তু ছানা করতে হলে, দুধকে নষ্ট করে তারপর কেটে করতে হয়। যা আসলে দুধকে বিকৃত করা এবং তা ধর্ম বিরোধী।

সুকুমার সেন তার “কলিকাতা কাহিনী” তে লিখেছেন – “ক্ষীর, মাখন, ঘি, দই এগুলো কাচা দুধের স্বাভাবিক পরিণাম, কৃত্রিম বা স্বাভাবিক। কিন্তু কোনটাই দুধের বিকৃত নয়। ছানা কিন্তু ফাটানো দুধের কৃত্রিম বিকৃতি”। প্রাচীন ভারতে ননী আর মাখন ছিল বিক্ষাত। বাংলার প্রাচীন যদি কোন মিষ্টি বলা যায় (মিষ্টান্ন না), তা হচ্ছে সন্দেশ। এই সন্দেশের প্রচলন পর্তুগিজরা আসার বহু আগে থেকেই ছিল। সেই সময় চিঠির আদান প্রদান ছিল এবং চিঠির সাথে সন্দেশ উপহার হিসাবে পাঠানো ছিল সেই সময়ের রেওয়াজ। কিন্তু সেই সন্দেশ গুলো ছানার ছিল না।

সেই সন্দেশ তৈরি হতো – বেসন, নারকেল, মুগের ডালের সাথে চিনি মিশ্রিত করে, অনেকে আবার গুড়ও মিশ্রিত করতেন। সেই থেকেই হয়তো কোন দাওয়াতে বা খুশি খবরের সাথে মিষ্টি পাঠানো আমাদের বাঙ্গালিদের একটা রেওয়াজে পরিণত হয়। বাংলাদেশীদের নিজস্ব কোন খুব প্রাচীন মিষ্টির কথা বলতে হয়, তাহলে বলা যায় নাটোরে কাঁচা গোল্লার সন্দেশ।

লেখাঃ খালিদ হাসান খান সঞ্জীব ছবিঃ খালিদ হাসান খান সঞ্জীব তথ্যঃ সপ্তডিঙ্গা, রোরমিডিয়া, উইকিপিডিয়া, দৈনিক যুগান্তর, বাঙলা খাবারের ইতিহাস।

আপনার কোন প্রশ্ন থাকলে বা এই বিষয়ে কোন কিছু জানানোর থাকলে নীচের মন্তব্য বিভাগে লিখতে ভুলবেন না । আপনার ভ্রমণ পিয়াশি বন্ধুদের সাথে নিবন্ধটি শেয়ার করে নিন যাতে তারাও জানতে পারে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here